১৬/১৭তম পর্ব
মুসলিম দার্শনিকগণ জ্যোতির্বিজ্ঞানে ইরানী ও ভারতীয় অর্জন বা উদ্ভাবনীগুলোকে কাজে লাগিয়ে অনেক মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন। বিভিন্ন প্রকার সোলার সিস্টেম ঘড়ি তৈরি, গ্রহ নক্ষত্রের উচ্চতা ও গতিবিধি নির্নায়ক যন্ত্র অ্যাসট্রোলেইব আবিষ্কার, সময় নির্নায়ক সরঞ্জাম ইত্যাদি মুসলিম মনীষীদের অবদান। মুসলিম মনীষীগণ বহুধরনের অ্যাসট্রোলেইব তৈরি করেন। এগুলোর কার্যক্রম এতো উন্নত মানের ছিল যে ব্যবহারিক দিক থেকে এগুলো বর্তমান যুগের কম্পিউটারের নির্ভুল ফলাফলের সাথে তুলনাযোগ্য। সময় নির্নায়ক বিদ্যা বা ক্রোনোলজি সম্পর্কে মুসলমান বিজ্ঞানীরা যখন ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন তখন ইউরোপে এই সময় নির্দেশক ঘড়ি বা যন্ত্রের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ
অবদানগুলোর মাঝে একটি হলো ভূপৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের উপায় নিয়ে
চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানো। ইতিহাসের বিচিত্র তথ্যপঞ্জী অনুযায়ী আব্বাসীয়
খলিফা মামুন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আদেশ দিয়েছিলেন ভূপৃষ্ঠকে পরিমাপ করার
জন্যে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তখন তাদের পূর্ববর্তী মনীষীদের বিশেষ করে গ্রিক
মনীষীদের রেখে যাওয়া পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করে নতুন আরেকটি পদ্ধতি আবিষ্কার
করলেন। এই পদ্ধতিটা বেশ আকর্ষণীয় ছিল সবার কাছে। এর কিছুদিন পর আবু রেইহান
বিরুনি অ্যাসট্রোলেইব ব্যবহার করে আরো একটি পদ্ধতি আবিষ্কারে হাত দেন। তাঁর
এই বিখ্যাত আবিষ্কারটির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে তাঁরই লেখা ভূপৃষ্ঠ
পরিক্রমা নামক বইতে।
নক্ষত্রবিদ্যার ক্ষেত্রে মুসলিম মনীষীদের
কাজের সূত্রপাত ঘটে টলেমির বই অনুবাদের মধ্য দিয়ে। তাঁর বইটি অনুবাদের পর
এর ব্যাখ্যাধর্মী আরো অনেক বই লেখা হয়। সেইসব গবেষণা থেকে টলেমির
দৃষ্টিভঙ্গির কিছু নেতিবাচক দিক বেরিয়ে আসে মুসলিম বিজ্ঞানীদের বিবেচনায়।
তারা টলেমির দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈপরীত্য পোষণ করে এবং
নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলমান
বিজ্ঞানীদের সেইসব মতামত বর্তমানে ‘কোপারনিক-পূর্ব' দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে
বিখ্যাত। টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত লেখাগুলোর বহু অনুবাদ এবং
অসংখ্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে এগুলোর মধ্য থেকে তিনটি অনুবাদ এবং বেশ
কিছু বিশ্লেষণ এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। টলেমি পাঠের ফলে মুসলিম বিজ্ঞানীগণ
নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে এস্ট্রোনমিকেল টেবলস তৈরিতে
উদ্বুদ্ধ হন এবং পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থৈরি কেরন। নক্ষত্র সম্বন্ধে যথার্থ
তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার লক্ষ্যেই এইসব চেষ্টা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল এবং
চেষ্টাগুলো সফলও হয়েছিল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ
সমস্যাগুলোর মাঝে একটি ছিল সৌরবর্ষের দৈর্ঘ নিরূপণ করা। এ লক্ষ্যে মুসলিম
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অবিরাম পর্যবেক্ষণের ফলে মুসলিম বিশ্বে সময় গণনা
বিদ্যার উন্নয়ন ঘটে। সৌরবর্ষের ৈদৈর্ঘ গণনা করতে গিয়েই তাঁরা মুসলিম বিশ্বে
পঞ্জিকার উদ্ভব ঘটান। জালালী পঞ্জিকাই তার ঐতিহাসিক উদাহরণ। এভাবেই
সৌরবর্ষের সময়সীমা বা কালক্ষণ বাত্তানী এবং খযানীর মতো মুসলিম বিজ্ঞানীদের
হাতেই নিরূপিত হয়।
এস্ট্রোনমিকেল টেবলস তৈরির জন্যে বারবার
পর্যবেক্ষণ চালানোর ফলে নক্ষত্র সম্পর্কে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নতুন
নতুন তথ্য দিতে শুরু করলেন। মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ বুঝতে পারলেন
জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে পূর্বেকার ধারণাগুলোতে সমস্যা রয়েছে। মুসলমান
জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ সুষ্ঠু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে টলেমির থিওরিগুলোর
ব্যাপারে প্রশ্ন বা সন্দেহের জন্ম দিলেন। ইবনে সিনা তাঁর জযেোতির্বিজ্ঞান
সংক্রান্ত লেখায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনিও মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতোই টলেমির থিওরির গ্রহণযোগ্যতার
ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন। টলেমির থিওরিটি ছিল ‘এই পৃথিবী হচ্ছে সমগ্র
বিশ্বের কেন্দ্র।'
টলেমির থিওরিটির ব্যাপারে আরো যেসব
জ্যোতির্বিজ্ঞানী বিরোধীতা করেছেন তাদের মধ্যে খাজা নাসিরুদ্দিন তুসি
অন্যতম। তিনিও টলেমির থিওরিটির অনেক ভুলভ্রান্তি তুলে ধরেছেন। টলেমির
থিওরিটির মধ্যে ছিলো গ্রহ-নক্ষত্রগুলো পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে-তাঁর এই মতামত
সম্পর্কে সন্দেহ েোষণ করেন তুসি। নাসির উদ্দিন তুসির এই মতামত মুসলিম
বিশ্বের একেবারে পশ্চিম প্রান্ত তথা স্পেনসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের
বিজ্ঞানীগণ অনুমোদন করেন। নাসিরুদ্দিন তুসির পর আবু রেয়হান বিরুনি, ইবনে
হিশামসহ আরো অনেক মুসলিম বিজ্ঞানীই টলেমির থিওরির সমালোচনা শুরু করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে কপলার এবং কোপারনিক মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রভাবিত ছিলেন
বিশেষ করে খাজা নাসির উদ্দিন তূসির প্রভাব তাদের ওপর ব্যাপকভাবে পড়েছিল।
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উচ্চতর গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয় চিকিৎসা
বিদ্যায় তাদেঁর অগ্রগতির পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানেও তাদের অবদান
উল্লেখযোগ্য। মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন আহমাদ বিন
আব্দুল্লা.. মারুযি। মারুযি হিজরী ২০৯ থেকে ২২০ সালর পর্যন্ত নক্ষত্র
পর্যবেক্ষণে আত্মনিয়োজিত ছিলেন। চাঁদের পরিক্রমণও নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রেখে গেছেন। আবু আব্দুল্লা.. মুহাম্মাদ বিন জাবের বাত্তানী একজন
বিখ্যাত মুসলিম গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। হিজরী ২৪৪ সালের দিকে
তিনি হাররানে জন্মগ্রহণ করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর অবদানগুলো
খুবই মূল্যবান। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে তিনি
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মাঝে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আবু রেয়হান বিরুনিসহ মুসলিম অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাবের বাত্তানীর
দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ভ্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন। নতুন চাঁদ দেখার ব্যাপারে তিনি
নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি দেন। সূর্যের পরিভ্রমণ সম্পর্কে নিকোলাস যে থিওরি দেন
তা সুস্পষ্টভাবেই বাত্তানীর দৃষ্টিভি্গির প্রভাবে প্রভাবিত। বাত্তানীর
উদ্ভাবনীগুলো সমগ্র ইরেোপে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।সৌরবিজ্ঞানে রেো যেসব জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহা মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন তাদের মধ্যে আবুল ভাফায়ী বুযজানী নাম উল্লেখেোগ্য। ৩২৮ হিজরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাগদাদে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণা কাজগুলো চালিয়েছিলেন। চন্দ্রগহণের সময় নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে আবু রেয়হান বিরুনির সাথে তিনিও সহয়োগিতা করেছিলেন। বুজডানীও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মূল্যবান বহু বই লিখেছেন। এগুলোর মাঝে পূর্নাঙ্গ অ্যাস্ট্রোনমিকেল চার্ট একটি। কী করে দূরত্ব পরিমাপ করা যায়, পাহাড়ের উচ্চতা নির্ণয় করা যায়, নদীর দৈর্ঘ নির্ধারণ করা যায় সেসব যন্ত্র থৈরির দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন এ বইতে। এই যন্ত্র দিয়ে অ্যাসট্রোলেইবের কাজও চালানো যেত।
১৭তম পর্ব
গত কয়েকটি আসরে আমরা জ্ঞানের বিভিন্ন
শাখায় মুসলিম মনীষীদের অবদানের সংক্ষিপ্ত অথচ ঐতিহাসিক কিছু চিত্র তুলে
ধরার চেষ্টা করেছি। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদির
পাশাপাশি পদার্থবিদ্যা কিংবা মেকানিকসেও মুসলিম মনীষীদের ব্যাপক অবদান
থাকলেও সেগুলো খুব একটা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয় নি। তাই আজকের আসরে
মেকানিক্স বা যন্ত্রকৌশল বিষয়ে মুসলমানদের অবদান নিয়ে খানিকটা কথা বলার
চেষ্টা করবো।
যন্ত্রকৌশলবিদ্যা বিভিন্ন রকম সরঞ্জামাদি
বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার পদ্ধতি সংক্রান্ত বিদ্যা। আধুনিককালের
যন্ত্রকৌশলবিদ্যার সাথে আগেকার সেই মেকানিক্সের নিকট সম্পর্ক রয়েছে।
মুসলমান বিজ্ঞানীদের কাছে জ্ঞানের স্তর বিন্যাসে মেকানিকও গণিত, জ্যামিতি,
জ্যোতির্বিজ্ঞান, মিউজিক ইত্যাদির মতোই বিদ্যার আলাদা একটি শাখা হিসেবে
বিবেচিত ছিল। ক্রুসেড যুদ্ধ ছিল বিভিন্ন সভ্যতার মাঝে জ্ঞান ও বিদ্যার
বিনিময় বিশেষ করে যন্ত্রকৌশলবিদ্যা এবং কারিগরী বিদ্যা মুসলমানদের কাছ
থেকে পাশ্চাত্যে যাবার একটি প্রধান কারণ। যন্ত্রকৌশলবিদ্যার ক্ষেত্রে যেসব
বইপুস্তক মুসলিম বিজ্ঞানীগণ লিখেছেন সেসব খুব কমই ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে
অনূদিত হয়েছিল। তবে ক্রুসেড যুদ্ধের সময় পাশ্চাত্য মুসলিম বিজ্ঞানীদের
ব্যাপক উন্নতি ও অগ্রগতি দেখে বিস্মিত হয়। মুসলমানরা স্বয়ংক্রিয় ঘড়ি, ভারি
মালামাল উত্তোলন করার বিভিন্ন যন্ত্রসহ বিভিন্ন রকমের সামরিক সরঞ্জাম থৈরি
করেছিল। যন্ত্রকৌশলবিদ্যায় কী রকম অগ্রগতি মুসলিম বিজ্ঞানীগণ অর্জন
করেছিলেন এসব তার ক্ষুদ্র প্রমাণ।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, মুসলমান প্রকৌশলীগণ
মধ্যপ্রাচ্য এবং মেডিটেরিয়ান অঞ্চলের বিজ্ঞানীদের প্রকৌশলগত অর্জন থেকে
প্রভাবিত হয়ে থাকবে। মিশরীয় এবং রোমানরা যন্ত্রকৌশলে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ
করেছিল তবে সবার চেয়ে বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছিল গ্রিস। আব্বাসীয় খেলাফতের
সময় গ্রিক ভাষা এবং সুরিয়ানী ভাষার বহু বই আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। সে
সময় মুসলমানদের হাতে জলঘড়ির প্রযুক্তির ওপর একটি বই ছিল। মুসলিম বিজ্ঞানী
জাযারি এই বইটিকে যন্ত্রকৌশল বিদ্যার অন্যতম একটি উৎস বলে মনে করেন।
বদিউযযামান জাযারি ছিলেন প্রাচীন আমলে মুসলমান যন্ত্রকৌশল বিজ্ঞানীদের
মধ্যে খুবই খ্যাতিমান। হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে এবং সপ্তম
শতাব্দির প্রথমার্ধের শুরুতে তুরস্কের দিয়ারবাক্র শহরে বাস করতেন। জাযারি
দিয়ারবাকরের শাসক মালেক সালেহর আহ্বানে তাঁর লেখা যন্ত্রকৌশল বিষয়ক এই বইটি
লিখেছিলেন।
যন্ত্রকৌশল বিদ্যায় তাঁর এই লেখা এ বইটি সমকালীন গবেষক বা জ্ঞানীদের মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয় এবং তাকে প্রকৌশলীদের প্রধান উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয় দিক থেকে তিনি ব্যাপক দক্ষ ছিলেন বলেই এ ধরনের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। জাযারি তার কাজের ব্যাপরে ভীষণ মেধা এবং সৃজনশীলতার অধিকারী ছিলেন। অত্যন্ত জটিল সরঞ্জামাদির ব্যাপারেও তিনি একেবারে যথার্থ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতেন। মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতার ওপর তিনি খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন। অভিজ্ঞতাহীন কোনো জ্ঞানকে তিনি গ্রহণ করতে চাইতেন না। মেসোপটেমিয়া, ভারত এবং ইরানের সভ্যতাগুলোর মতো ইসলামপূর্ব সভ্যতায় মুসলমান প্রকৌশলীদের আবিষ্কার ও নতুন নতুন উদ্ভাবনীগুলোর মাঝে জাযারির আবিষ্কার গ্রন্থিত মালার ছোট্ট একটি বৃত্তের মতো। মুসলিম এই বিজ্ঞানীর একটি বই আছে ‘আল-জামেউ বাইনাল এলমি ওয়াল আমাল,আন-নাফেউ ফি সানাআতিল হিয়াল' নামে। তাঁর এই বইটি আগেকার যুগে হাইডরেোলিক ও মেকানিক্যাল সরঞ্জামাদি সম্পর্কে জানার ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো একটি বই ছিল। এ বইটিতে থিউরি এবং ব্যবহারিক পদ্ধতির মাঝে এক ধরনের মিল লক্ষ্য করা যায়। বিংশ শতাব্দির প্রথম কয়েক দশকে জার্মানীর বিখ্যাত দুই গণিতবিদ এ্ই বইটির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং এ বইয়ের কিছু কিছু অংশ তাঁরা তাদেঁর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিবেদনে অনুবাদও করেন, উদ্ধৃতও করেন। এদের একজন হলেন বিদম্যান এভং অপরজন হাউজার। পরবর্তীকালে অবশ্য জাযারির বইগুলো ডোনাল্ড হেইলের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয় এবং বই আকারে প্রকাশিত হয়। এরপর আহমাদ ইউসুফ আল হাসান নামে সিরীয় এক মনীষী ১৯৭৯ সালে জাযারির পুর্ণাঙ্গ বইটিকে আরবি থেকে সিরিয়ার ভাষায় অনুবাদ করেন। উল্লেখ করা যায় যে জাযারির বইটির ফার্সি সংস্করণ এখনো তেহরানের শহীদ মোতাহহারী হাইস্কুলের লাইে্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।
যন্ত্রকৌশল বিদ্যায় তাঁর এই লেখা এ বইটি সমকালীন গবেষক বা জ্ঞানীদের মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয় এবং তাকে প্রকৌশলীদের প্রধান উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয় দিক থেকে তিনি ব্যাপক দক্ষ ছিলেন বলেই এ ধরনের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। জাযারি তার কাজের ব্যাপরে ভীষণ মেধা এবং সৃজনশীলতার অধিকারী ছিলেন। অত্যন্ত জটিল সরঞ্জামাদির ব্যাপারেও তিনি একেবারে যথার্থ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতেন। মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতার ওপর তিনি খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন। অভিজ্ঞতাহীন কোনো জ্ঞানকে তিনি গ্রহণ করতে চাইতেন না। মেসোপটেমিয়া, ভারত এবং ইরানের সভ্যতাগুলোর মতো ইসলামপূর্ব সভ্যতায় মুসলমান প্রকৌশলীদের আবিষ্কার ও নতুন নতুন উদ্ভাবনীগুলোর মাঝে জাযারির আবিষ্কার গ্রন্থিত মালার ছোট্ট একটি বৃত্তের মতো। মুসলিম এই বিজ্ঞানীর একটি বই আছে ‘আল-জামেউ বাইনাল এলমি ওয়াল আমাল,আন-নাফেউ ফি সানাআতিল হিয়াল' নামে। তাঁর এই বইটি আগেকার যুগে হাইডরেোলিক ও মেকানিক্যাল সরঞ্জামাদি সম্পর্কে জানার ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো একটি বই ছিল। এ বইটিতে থিউরি এবং ব্যবহারিক পদ্ধতির মাঝে এক ধরনের মিল লক্ষ্য করা যায়। বিংশ শতাব্দির প্রথম কয়েক দশকে জার্মানীর বিখ্যাত দুই গণিতবিদ এ্ই বইটির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং এ বইয়ের কিছু কিছু অংশ তাঁরা তাদেঁর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিবেদনে অনুবাদও করেন, উদ্ধৃতও করেন। এদের একজন হলেন বিদম্যান এভং অপরজন হাউজার। পরবর্তীকালে অবশ্য জাযারির বইগুলো ডোনাল্ড হেইলের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয় এবং বই আকারে প্রকাশিত হয়। এরপর আহমাদ ইউসুফ আল হাসান নামে সিরীয় এক মনীষী ১৯৭৯ সালে জাযারির পুর্ণাঙ্গ বইটিকে আরবি থেকে সিরিয়ার ভাষায় অনুবাদ করেন। উল্লেখ করা যায় যে জাযারির বইটির ফার্সি সংস্করণ এখনো তেহরানের শহীদ মোতাহহারী হাইস্কুলের লাইে্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।
জাযারির বিখ্যাত বইটি মেকানিক্যাল বিভিন্ন
সরঞ্জামের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দিক থেকে খুব্ই মূল্যবান একটি বই হিসেবে
স্বীকৃত। সত্যিই ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত জাযারির গবেষণা এবং
উদ্ভাবনীগুলোর গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। বিজ্ঞানের ইতিহাস বিষয়ক মহান
ইতিহাসবিদ জর্জ শার্টুন জাযারির বই সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সংশ্লিষ্ট বিষয়ের
পূর্ণাঙ্গ একটি বই এটি। যন্ত্রকৌশলবিদ্যা সংক্রান্ত বিশেষ করে যন্ত্র
পরিচিতি ও তার বিশদ ব্যাখ্যা সম্পর্কে মুসলমানদের একটি শ্রেষ্ঠ বই এটি।'
জাযারি যে-কোনো শিল্প সরঞ্জাম তৈরির পদ্ধতি যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর
বইতে, আজকের যুগের শিল্পস্রষ্টারাও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে যে-কোনো সরঞ্জাম
খুব সহজেই তৈরি করতে পারেন। যন্ত্রকৌশলবিদ্যার বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন জাযারি
এমন একটি মেশিন সম্পর্কে পুরো ডিজাইন দিয়ে গেছেন, যন্ত্রকৌশলবিদ্যার
পরিপূর্ণতার ক্ষেত্রে যার ভূমিকা অপরিসীম।
বলা যায়, এমন বহু পার্টস এবং পদ্ধতি
জাযারি ব্যবহার করেছেন, যেগুলোকে নয়া প্রকৌশল সামগ্রী হিসেবে গণ্য করা হয়।
কিছুদিন আগে জাযারি প্রদত্ত ব্যাখ্যা ও পদ্ধতি অনুসরণ করে তৈরি করা বেশ
কিছু শিল্প-সরঞ্জাম লন্ডনে অনুষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ব উৎসবে পাঠানো হয়েছে।
এসবের মধ্যে রয়েছে পাম্পার বা হাওয়া ঢুকানোর যন্ত্র, রক্ত নেওয়ার যন্ত্র
এবং বিরাট জলঘড়ি। শ্রোতাবন্ধুরা! ঘড়ির প্রসঙ্গ এসে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলো
আজ আর আমাদের হাতে সময় নেই কথা বলার। তাই পরবর্তী আসরে যন্ত্রকৌশলবিদ্যা
এবং পদার্থবিদ্যায় মুসলিম বিজ্ঞানীদের আরো কিছু অর্জন ও অবদান নিয়ে কথা
বলার ইচ্ছে রইলো।



0 comments:
Post a Comment