তৃতীয়ত : নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ :
নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ ইখলাছ অবলম্বনে বাধা
হয়ে দাঁড়ায়। প্রবৃত্তির অনুসরণ বলতে বুঝায় নিজের মনে যা
চায় সেটাই করা বা তার দিকে ঝুঁকে পড়া। নিজের প্রবৃত্তির অনুগত
হয়ে পড়া। প্রবৃত্তিকে উপাস্য হিসেবে নেয়া বলতে এটাকেই
বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ
هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا﴾ أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ
يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ
سَبِيلًا﴾ . الفرقان: 43-44
তুমি কি দেখ না তাকে, যে তার কামনা-বাসনাকে ইলাহ (উপাস্য) রূপে
গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার কর্মবিধায়ক হবে? তুমি কি মনে কর যে, তাদের অধিকাংশ শোনে ও বুঝে? তারা তো পশুর মতই ; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। (সূরা আল-ফুরকান : ৪৩-৪৪)
আল্লাহ আরো বলেন :-
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ
هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ
وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا
تَذَكَّرُونَ .
الجاثية : 23
তুমি কি লক্ষ্য করেছো তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজ ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ জেনে-শুনে তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং
তার কর্ণ ও হৃদয় সীল করে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর দিয়েছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? (সূরা আল-জাসিয়া : ২৩)
আল্লাহ আরো বলেন :-
فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ
فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنَ اتَّبَعَ
هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ
الظَّالِمِينَ . القصص: 50
এরপর তারা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে জেনে রাখবে তারা তো নিজেদের খেয়াল-খুশীর
অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অগ্রাহ্য করে যে ব্যক্তি
নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক বিভ্রান্ত আর কে? আল্লাহ যালিম সমপ্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না। (সূরা আল-কাছাছ : ৫০)
যে প্রবৃত্তির অনুগত হয়ে পড়ে তার সম্পর্কে
আল্লাহর বক্তব্য এমনি পরিস্কার। প্রবৃত্তির অনুগত হওয়া
বলতে বুঝায়;
যখন যা মনে চায়, তাই করা। তাকওয়া ও পরহেযগারী, হারাম-হালাল, জায়েয-না জায়েয, মাকরূহ-মুবাহ ইত্যাদির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন : যে ব্যক্তি
প্রবৃত্তির অনুসরণ করে প্রবৃত্তি তাকে অন্ধ ও বধির বানিয়ে দেয়, ফলে সে স্থির করতে পারে না যে আল্লাহ ও তার
রাসূলের জন্য তার করণীয় কি, আল্লাহ ও রাসূল যাতে সন্তুষ্ট হন সে তাতে সন্তুষ্ট হতে পারে না, আল্লাহ ও রাসূল যাতে ক্রোধান্বিত হন, তাতে তো তার রাগ জন্মায় না। বরং নিজের সন্তুষ্টি ও নিজের অসন্তুষ্টিই হল তার লক্ষ্য। (মিনহাজ আস-সুন্নাহ : ইবনু তাইমিয়া)
যারা জান্নাতের অধিকারী হবে তাদের প্রসঙ্গে
আল্লাহ বলেছেন :
وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى . النازعات : 40
সে নিজেকে প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে বিরত রেখেছে। (সূরা আন-নাযেআত :৪০)
অতএব প্রবৃত্তির অনুসরণ ইখলাছে পরিপন্থী ও নেক আমল বিনষ্টকারী।
উমার ইবনু আব্দুল আযীয রহ. বলেছেন : তুমি
এমন হয়ো না যে সত্য যদি তোমার মনপুত হয় তাহলে গ্রহণ করবে আর যদি তোমার মনের বিরুদ্ধে
যায় তাহলে বিরোধিতা করবে। এমন চিন্তা-ভাবনা নিয়ে সত্য গ্রহণ করলে তুমি
কোন প্রতিদান পাবে না। এবং বাতিল বর্জন করে শাসি- থেকে বাঁচতে পারবে
না। কারণ তুমি যে সত্য গ্রহণ করেছো ও মিথ্যাকে
বর্জন করেছো তা তোমার মনের মত হওয়ার কারণে। আল্লাহর জন্য নয়। (শরহু আল-আকীদাহ আত-তাহাবীয়্যাহ)
ইমাম শাতেবী রহ. বলেছেন: প্রবৃত্তির চাহিদায়
কোন ভাল কাজও প্রশংসনীয় হতে পারে না। (আল-মুআফিকাত : শাতেবী)
আসলেই প্রবৃত্তির বিরোধিতা করা একটা মস্তবড়
কঠিন কাজ। এ কাজ করতে না পারার কারণেই অনেক ইহুদী ও
খৃষ্টান এবং বহু অমুসলিম ব্যক্তি ইসলামকে সত্য বলে অনুভব করার পরেও তা কবুল করতে পারেনি। তারা নিজেদের সমপ্রদায়, দেশ, ধন-সম্পদ বিসর্জন দিতে রাজী হয়েছে কিন্তু প্রবৃত্তির বিরোধিতা করতে রাজী হয়নি। তাদের লক্ষ করেই আল্লাহ বলেছেন :-
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ
هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ
وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا
تَذَكَّرُونَ .الجاثية:
23
তুমি কি লক্ষ্য করেছো তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজ ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ জেনে-শুনে তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং
তার কর্ণ ও হৃদয় সীল করে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর দিয়েছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? (সূরা আল-জাসিয়া : ২৩)
ইমাম শাতেবী রহ. চমৎকার বলেছেন : শরীয়তের
বিধি-বিধানের উদ্দেশ্য হল মানুষকে তার প্রবৃত্তির গোলামীকে বের করে আল্লাহর গোলামীতে
স্বাধীন করে দেয়া। শরীয়তের পূর্বে সে প্রবৃত্তির বাধ্যগত দাস
ছিল ইসলামী শরীয়ত গ্রহণের ফলে সে আল্লাহর স্বাধীন দাসে পরিণত হলো। (আল-মুআফিকাত : শাতেবী)
অতএব যিনি ইখলাছ অবলম্বন করতে চান তার কর্তব্য
হল, নিজের সংকল্প ও ইচ্ছাকে
দৃঢ় করা, আল্লাহর নিকট উপস্থিতিকে ভয় করা, নিজের প্রবৃত্তিকে বাধা দেয়া। তাহলে স্থায়ী বাসস্থান হিসেবে জান্নাতের অধিকারী হওয়া যাবে। (আল-ইখলাছ : আল- আশকর)
হাসান বসরী রহ. বলেন : সর্বোত্তম জিহাদ হল
প্রবৃত্তির বিরাধিতা। (আদাবুদ্দুনিয়া ওয়াদ-দীন : আল-মাওয়ারেদী)
ইবনুল জাওযী রহ. বলেন : মানুষের কর্তব্য হল, সকল সৎকর্ম করবে আল্লাহকে সন'ষ্ট করার জন্য, আল্লাহকে নিজের সম্মুখে উপস্থিত জেনে ও আল্লাহর
নির্দেশ বাস-বায়নের জন্য। যদি এ তিনটি শর্ত পূরণ করে সৎকর্ম বা নেক
আমল করা যায়, তাহলে সকল সৃষ্টিজীব তার পক্ষে থাকবে, সকল কল্যাণ তার কাছেই ছুটে আসবে। আর যদি মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রবৃত্তির দাসত্ব করা হয় তবে
ফলাফল হবে উল্টো। (তাফসীর ইবনু কাসীর)



0 comments:
Post a Comment