১০- ইখলাছকে জীবনের একটি লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করা :
ইখলাছ অবলম্বন করতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা
অনেক। কিন্তু সত্যিকার মুখলিছদের সংখ্যা খুবই কম। এর কারণ ইখলাছ অবলম্বনে প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও তারা ইখলাছকে
জীবনের একটি লক্ষ্য হিসেবে নিতে পারেনি। একে একটি লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে এর অনুশীলনের প্রশ্ন আসে, মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনার বিষয় আসে। এ ভাবনাগুলো ইখলাছ অবলম্বন করতে সহায়তা করে। যদি কেউ এটাকে অতিরিক্তি সওয়াবের বিষয় বা নফল কাজ হিসেবে মুল্যায়ন
করে, তাবে সে হয়ত কখনো ইখলাছ
অবলম্বনে সফল হতে পারবে না।
ইখলাছের পথে যা বাধা হয়ে দাড়ায়
এমন কিছু বিষয় আছে যা ইখলাছের পথে বাঁধা হয়ে
দাঁড়ায়। নিম্নে আমরা তার উল্লেখযোগ্য কিছু উপস্থাপন করছি।
প্রথমত : রিয়া ও ছুমআ :
রিয়া অর্থ লোক দেখানো ভাবনা আর ছুমআ অর্থ
মানুষকে শোনানো বা প্রচারের ভাবনা।
পারিভাষিক অর্থে রিয়া হল মানুষকে দেখিয়ে তাদের
প্রশংসা অর্জনের জন্য ইবাদত-বন্দেগী তথা সৎকর্মগুলো প্রকাশ করা। (ফাতহুল বারী : ইবনু হাজর)
ইমাম গাযালী রহ. বলেন : রিয়া হল ভাল কাজ-কর্ম
মানুষকে দেখিয়ে তাদের অন-রে নিজের স্থান করে নেয়া, যাতে লোকের কাছে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
আর ছুমআ হল নিজের ইবাদত-বন্দেগীর কথা মানুষকে
শোনানো। (আল-ইখলাছ : আল-আশকর)
রিয়া ও ছুমআর ব্যাপারে হাদীসে সতর্কবাণী এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-
ألا أخبركم بما هو أخوف عليكم عندي من
المسيح الدجال، قال : قلنا بلى ، فقال: الشرك الخفي أن يقوم الرجل يصلي فيزين
صلاته لما يرى من نظر رجل .رواه ابن ماجة: 4204
আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবো
না যাকে আমি দাজ্জালের চেয়ে বেশী ভয় করি? আমরা বললাম, অবশ্যই আপনি আমাদের বলে দেবেন। তিনি বললেন : তা হল সুক্ষ্ম শিরক, তা এমন যে, কোন ব্যক্তি সালাত আদায় করতে দাঁড়িয়ে খুব
সুন্দর করে আদায় করল, কিন্তু তার অন-রে ক্রিয়াশীল
ছিল অন্যকে দেখানোর ভাবনা। (বর্ণনায় : ইবনে মাজাহ)
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন : মানুষের কর্তব্য
এই যে, সে আল্লাহর হুকুমসমূহ পালন করবে, তাঁর নিষেধ থেকে ফিরে থাকবে শুধু তাকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে। এছাড়া যদি সে এর মাধ্যমে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব লাভের নিয়্যত করে, অন্যকে অবমাননা করার সংকল্প করে, তাহলে এটা হবে জাহিলিয়্যাত। যা আল্লাহর কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আবার সে যদি এ কাজগুলো মানুষকে দেখানো বা প্রচারের উদ্দেশ্যে করে, তবে তার কোন সওয়াব থাকবে না। (মিনহাজ আস-সুন্নাহ : ইবনু তাইমিয়া)
দ্বিতীয়ত : আত্মতৃপ্তি
আত্মতৃপ্তি মানে এক ধরণের আত্মম্ভরিতা বা
অহংকার। এটা কথা-বার্তা, চাল-চলন, কাজ-কর্মে অহংকার প্রকাশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। আত্মতৃপ্তি রোগে আক্রান- ব্যক্তি নিজেকে অত্যন- সৎ মনে করে, পাক-সাফ ও অন্যের চেয়ে এগিয়ে আছি-এমন একটি
ধারণা তার মাঝে সর্বদা কাজ করে। আত্মতৃপ্তি মানুষের
আত্মার জন্য একটি ভয়াবহ ব্যধি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বলেছেন :-
ثلاث مهلكات : شح مطاع، وهو متبع، وإعجاب
المرء بنفسه. رواه الطبراني في الأوسط : 5452 وحسنه الألباني
তিনটি বিষয় মানুষকে ধ্বংস করে দেয় : অব্যাহত
কৃপণতা, নিজ প্রবৃত্তির আনুগত্য, নিজের ব্যাপারে সু-ধারণা পোষণ বা আত্মতৃপ্তি। (বর্ণনায় : তাবারানী)
আত্মতৃপ্তি মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। কারণ এ রোগে আক্রান- ব্যক্তি নিজের ইবাদত-বন্দেগীকে বড় করে দেখে, তার ধারণা, সে স্বয়ং আল্লাহর উপকার করছে, আল্লাহ তাআলা যে নিজ অনুগ্রহে তাকে ভাল পথে
চলার সামর্থ দিয়েছেন এ কথা সে ভুলতে বসে। ফলে, সে ইখলাছের সকল বিপদ থেকে অন্ধ হয়ে যায়। তার ইখলাছ অবলম্বনে কি কি বাধা রয়েছে এ সম্পর্কে সে সম্পূর্ন বে-খবরে পরিণত হয়।
আয়েশা রা. কে প্রশ্ন করা হয়েছিল মানুষ কখন
খারাপ হয়? তিনি বললেন : যখন মনে করে, সে খুব ভাল, তখন খারাপ হয়ে যায়। (ইহইয়াউ ঊলুম আদ-দীন : আল-গাযালী)
মাছরূক রহ. বলেন : মানুষের আলেম হওয়ার জন্য
এতটুকু যথেষ্ট যে সে আল্লাহকে ভয় করবে। আর জাহেল (মূর্খ) হওয়ার
জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে সে আত্মতৃপ্তিতে ভুগবে। (আদ-দুরুল মানসূর : আস-সুয়ূতী)
আত্মতৃপ্তি নামের এ ধ্বংসাত্মক রোগ থেকে কিভাবে
বেঁচে থাকা যায়?
কিভাবে এর চিকিৎসা
সম্ভব?
নিজের আত্মাকে সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে
হবে, লালন করতে হবে তাকে এবং নিজের প্রতিপালককে
চিনতে-জানতে হবে। প্রতিপালকের সাথে নিজেকে চিনতে হবে এভাবে
যে, আমার প্রতিপালক কত
মহান! তিনি আমার উপর কত অনুগ্রহ করেছেন। আমার মত লক্ষ-কোটি মানুষ রয়েছে, তাদেরকে তাঁর অনুগত হওয়ার সুযোগ দেননি, আমাকে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আমার কি কৃতিত্ব আছে? আমি কি ছিলাম? তিনি তাঁর একান্ত অনুগ্রহে আমাকে এ পর্যন্ত আসতে দিয়েছেন। আমি এখন যে সকল সৎ-কর্ম করছি তার সবগুলো কি তাঁর পছন্দ মত করছি? কি নিশ্চয়তা আছে এর?
একদিন মালেক ইবনু দীনারের কাছ দিয়ে মুহাল্লাব
ইবনু আবি সাফারাহ বীরের মত হেলে দুলে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তার এ অবস্থা দেখে মালেক ইবনে দীনার তাকে বললেন, তুমি কি জানো না যুদ্ধের ময়দানে শক্র সারি
ব্যতীত এ রকম হাঁটা ঠিক নয়? মুহাল্লাব উত্তরে গর্ব করে বললেন, তুমি কি চেন না আমি কে? মালেক ইবনে দীনার বললেন, হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভাল করে চিনি। মুহাল্লাব বললেন, তুমি আমার সম্পর্কে কি জানো? মালেক ইবনে দীনার বললেন, তোমার শুরুটা ছিল এক দুর্গন্ধময় বীর্য। তোমার শেষটা হবে একটি পঁচা লাশ। এর মধ্যবর্তী সময়ে তুমি বহন করে চলছ কতগুলো ময়লা-আবর্জনা।
আসলে মানুষ যতই গর্ব ও অহংকার করে থাক না
কেন, প্রত্যেকের আসল পরিচয়
তো এটাই, যা মালেক ইবনে দীনার রহ. বললেন। তাই, এ ধরণের অনুভুতি জাগ্রত রাখলে গর্ব,
অহংকার,
আত্মতৃপ্তি নামক রোগ-ব্যধি
থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।



0 comments:
Post a Comment